❤️ ভালোবাসার চল্লিশ নীতি ❤️
~মাওলানা শামস্ তাবরিজি রহঃ
নীতি ১, স্রষ্টা বলতে আমরা যা বুঝি, তা আসলে আমাদের নিজেদের সম্পর্কে ধারণারই সরাসরি প্রতিবিম্ব মাত্র। তার নাম নেয়ার সাথে সাথে যদি মনের মাঝে ভয় আর দোষারােপের চিহ্ন জেগে ওঠে, তাহলে বুঝতে হবে যে আমাদের মাঝে খুব বেশি ভয় আর আফসােস লুকিয়ে আছে। আবার আমরা যদি স্রষ্টাকে
ভালােবাসা আর দয়ার সাগর হিসেবে দেখি, তাহলে বুঝতে হবে সেই একই জিনিস রয়েছে আমাদের ভেতরে।
২, সত্যের দিকে যেই পথ, তাকে পাড়ি দিতে হয় হৃদয় দিয়ে, মস্তিষ্ক দিয়ে নয়। হৃদয়কে তােমার পথপ্রদর্শক বানিয়ে নাও, মনকে নয়। হৃদয়ের শক্তি দিয়ে তােমার নাফসের মুখােমুখি হও, তাকে দ্বন্দ্বে আহবান করাে, এবং পরাজিত করাে। নিজের অন্তরকে যখন জানতে পারবে, তখনই স্রষ্টাকে জানতে পারবে তুমি।
৩, এই মহাবিশ্বের সবার মাঝে, সব কিছুর মাঝে সৃষ্টিকর্তার পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়, কারণ তিনি কোনাে মসজিদ, সিনাগগ বা গীর্জায় সীমাবদ্ধ নন । কিন্তু তারপরেও যদি জানতে ইচ্ছে করে যে কোথায় তার বাস, তাহলে সেই প্রশ্নের জবাবে একটি কথাই বলা যায় সত্যিকার প্রেমিকের হৃদয়। স্রষ্টাকে একবার দেখার পর কেউ বেঁচে থাকেনি এটা যেমন সত্যি, তেমনি তার দর্শন পাওয়ার পর কেউ মৃত্যুবরণ করেনি এটাও সত্যি। তাকে যে খুঁজে পায়, অনন্তকালের জন্য সে তার মাঝে বিলীন হয়ে যায়।
৪ ভালােবাসা এবং বুদ্ধিমত্তা হচ্ছে সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস দিয়ে তৈরি। বুদ্ধিমত্তা মানুষকে বেঁধে রাখে, এবং এতে কোনাে ঝুঁকি নেই। কিন্তু ভালােবাসায় সব বন্ধন মুক্ত হয়ে যায়, আর সব কিছু পড়ে যায় ঝুঁকির মুখে। বুদ্ধিমত্তা হচ্ছে সদা সতর্ক, উপদেশ দিয়ে বলে, 'অধিক আনন্দ থেকে সাবধান,' আর অন্য দিকে ভালােবাসা বলে, কি আসে যায়! চলাে, ডুব দিই! বুদ্ধিমত্তা সহজে ভেঙে পড়ে না, অন্য দিকে ভালােবাসা এমনকি আপনা থেকেই ধুলােয় লুটিয়ে পড়তে পারে। কিন্তু সেই ধুলাের মাঝেই লুকিয়ে থাকে অমূল্য রত্ন। যে হৃদয় ভেঙে গেছে, সে লুকিয়ে রাখে সেই রত্ন।
৫, পৃথিবীর যত ভুল তার বেশিরভাগেরই উৎপত্তি হয়েছে ভাষাগত সমস্যা এবং সাধারণ ভুল বােঝাবুঝি থেকে। কারও মুখের কথায় কখনও আস্থা রাখা উচিত নয়। ভালােবাসার বৃত্তের মাঝে যখন তুমি পা রাখবে, তখন ভাষা বলে যে বস্তুকে আমরা জানি তা সম্পূর্ণ মূল্যহীন হয়ে যাবে। কথায় যাকে প্রকাশ করা যায় না, কবল নীরবতার মাঝ দিয়েই তাকে বােঝা যায়।
৬, একাকীত্ব এবং নির্জনতা এক জিনিস নয়। মানুষ যখন একাকী থাকে, তখন সহজেই ভাবতে পারে যে সে সঠিক পথে রয়েছে, অথচ তার ধারণা ভুল। নির্জনতাই আমাদের জন্য উত্তম, কারণ তাতে একাকী বােধ না করেই একা হওয়া যায়। কিন্তু এক সময় এমন একজন মানুষকে খুঁজে নিতেই হয়, যে তােমার আয়না হতে পারে। মনে রাখবে, কেবল অন্য এট মানুষের হৃদয়ের মাঝেই মানুষ নিজেকে এবং তার মধ্যকার সৃষ্টিকর্তাকে দেখতে পারে।
৭ তােমার জীবনে যাই ঘটুক না কেন, পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল মনে হােক না কেন, কখনও হতাশার ধারে-কাছেও যেও না। যখন সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এমনকি তখনও সৃষ্টিকর্তা শুধু তােমার জন্যই নতুন দরজা খুলে দিতে পারেন। কৃতজ্ঞ হও! যখন সব কিছু হাতের কাছে থাকে তখন কৃতজ্ঞ হওয়া সহজ। প্রকৃত সুফি সেই, যে নিজের প্রাপ্য সব কিছুর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়েই ক্ষান্ত হয় না, বরং যা কিছু তাকে দেয়া হয়নি তার জন্যও কৃতজ্ঞ বােধ করে।
৮, ধৈর্য ধরার মানে হচ্ছে কোনাে ঘটনার শেষ পর্যন্ত কি ঘটবে তা বুঝতে পারার মতাে দূরদৃষ্টির অধিকারী হওয়া, এবং তাকে বিশ্বাস করা। ধৈর্যের মানে কি? এর মানে হলাে কাঁটার দিকে তাকিয়ে গােলাপকে দেখতে পাওয়া, রাতের দিকে তাকিয়ে ভােরকে দেখতে পাওয়া। অধৈর্য হওয়ার অর্থ হচ্ছে ভবিষ্যতে ঘটনার ফলাফল কি হবে তা বুঝতে ব্যর্থ হওয়া। সৃষ্টিকর্তার প্রেমিকরা কখনও ধৈর্য হারায় না, কারণ তারা জানে যে বাঁকা চাঁদকে পূর্ণচন্দ্র রূপে দেখতে হলে সময়ের প্রয়ােজন।
৯, পুব, পশ্চিম, দক্ষিণ অথবা উত্তর-এতে কিছু আসে যায় না। গন্তব্য যাই হােক না কেন, নিশ্চিত থাকতে হবে যেন প্রতিটি যাত্রাই হয় নিজের অন্তর অভিমুখে যাত্রা। একমাত্র নিজের গভীরে ভ্রমণ করার মাধ্যমেই সমগ্র বিশ্ব, এবং তারও বাইরে ভ্রমণ করা যায় ।
১০, যে ধাত্রী সে জানে, যদি কোনাে কষ্ট না থাকে তাহলে শিশুর জন্মের সুগম হয় না, তাকে জন্ম দিতে পারে না তার মা। ঠিক তেমনি ভাবে কোনাে মানুষ যদি নতুন করে জন্ম নিতে চায়, তাহলেও কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে হয় তাকে। কাদামাটির পাত্র যেমন আগুনে পুড়েই শক্ত হয়, তেমনি কেবল কষ্টের মাধ্যমেই নিখুঁত হয়ে উঠতে পারে ভালােবাসা।
১১,ভালােবাসার অনুসন্ধান আমাদের বদলে দেয়। যারা ভালােবাসার সন্ধান করে, তাদের মাঝে এমন কোনাে সন্ধানী নেই যে এই পথে চলতে চলতে পরিপক্ক হয়ে ওঠেনি। যখনই তুমি ভালােবাসার সন্ধানে নামবে, তখনই তােমার ভেতর এবং বাইরে পরিবর্তন আসতে শুরু করবে।
১২, মহাকাশে নক্ষত্রের সংখ্যা যত, এই পৃথিবীতে নকল গুরু এবং মিথ্যা শিক্ষকের সংখ্যা তার চাইতেও বেশি। ক্ষমতালােভী, আত্মকেন্দ্রিক লােকদের সাথে সত্যিকারের শিক্ষকদের গুলিয়ে ফেলাে না। একজন সঠিক আধ্যাত্মিক গুরু কখনই তােমার মনােযােগকে নিজের দিকে টানার চেষ্টা করবেন না, এবং তােমার কাছ থেকে সর্বোচ্চ আনুগত্য বা প্রশংসাও চাইবেন না। তার বদলে তােমাকে সাহায্য করবেন তােমার আত্মাকে চিনতে এবং বুঝতে। সত্যিকারের শিক্ষকরা হন কাচের মতাে স্বচ্ছ, আর তাদের মাঝ দিয়ে কোনাে বাধা ছাড়াই প্রবেশ করে স্রষ্টার আলাে।
১৩, জীবনে যে সব পরিবর্তন আসবে তাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা কোরাে না। তার বদলে জীবনকে তােমার মাঝ দিয়ে বয়ে যেতে দাও। কখনও এই ভেবে ভয় পেয়াে না যে তােমার জীবন আমূল বদলে যাচ্ছে। নতুন যে জীবন আসবে, তা তাে আগের জীবনের চাইতে উত্তমও হতে পারে।
১৪, ভেতর এবং বাইরে-উভয় দিকেই মানুষকে গড়ে তােলার কাজ নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত আছেন স্রষ্টা। তার সম্পূর্ণ মনােযােগ রয়েছে মানুষের দিকে। প্রতিটি মানুষই এমন এক শিল্পকর্ম, যার সৃষ্টির কাজ কখনও সম্পূর্ণ হয় না, কিন্তু ক্রমেই কেবল নিখুঁত হয়ে উঠতে থাকে। আমরা প্রত্যেকেই এক অসম্পূর্ণ শিল্পকর্ম, একই সাথে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠার আশায় এবং অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছি। স্রষ্টা আমাদের প্রত্যেককে নিয়েই আলাদা ভাবে কাজ করেন, কারণ মানবজাতি হচ্ছে এক দক্ষ চিত্রকরের তৈরি এমন এক চিত্রকর্ম, যেখানে এমনকি একটি বিন্দুও সম্পূর্ণ ছবিটির জন্য খুবই দরকারী।
১৫, একজন নিখুঁত স্রষ্টাকে ভালােবাসা সহজ কাজ, কারণ তিনি নির্ভুল এবং নিষ্কলঙ্ক। তার চেয়ে অনেক কঠিন কাজ হলাে মানুষকে ভালােবাসা, তাদের সকল দোষক্রুটি এবং ভুলকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা। মনে রেখাে, মানুষ কেবল সেটুকুই জানতে পারে, যেটুকু সে ভালােবাসতে পারে। ভালােবাসা ছাড়া কোনাে জ্ঞানের আগমন ঘটে না। যতক্ষণ না আমরা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকে ভালােবাসতে পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই স্রষ্টাকে সত্যিকারের অর্থে জানার, ভালােবাসার কোনাে সুযােগ নেই।
১৬ ‘প্রকৃত ময়লা সেটাই, যা ভেতরে। '। বাকি যা কিছু তাকে খুব সহজেই পরিষ্কার করে ফেলা যায়। কিন্তু বিশুদ্ধ পানি দিয়ে পরিষ্কার করা যায় না এমন ময়লা শুধু একটাই আছে, আর তা হলাে আত্মার উপর লেগে থাকা ঘৃণা এবং বিদ্বেষের নােংরা দাগ। সংযম এবং উপবাসের মাধ্যমে শরীরকে পরিশুদ্ধ করা যায়, কিন্তু রিদয়কে পরিশুদ্ধ করতে পারে কেবল ভালোবাসা।
১৭,সমগ্র মহাবিশ্বকে খুঁজে পাওয়া যাবে কেবল একটি মানুষের ভেতর-সে হচ্ছে, তুমি । তােমার চারপাশে যা কিছু দেখাে, এমনকি যে সব জিনিস তােমার পছন্দ নয়, বা যে সব মানুষকে তুমি ঘৃণা বা অপছন্দ করাে, তার সব কিছুই তােমার ভেতরেই বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান। তাই, শয়তানকে খোঁজার জন্যেও নিজের বাইরে তাকানাের দরকার নেই। শয়তান এমন কোনাে অলৌকিক সত্তা নয় যা বাইরে থেকে সশরীরে মানুষকে আক্রমণ করবে। এটি মানুষের ভেতরে বসবাসকারী খুব সাধারণ এক কণ্ঠস্বর। যদি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে চিনতে পারাে, সততা এবং কঠোরতার সাথে নিজের অন্ধকার এবং উজ্জ্বল-উভয় দিকের মুখােমুখি হতে পারাে, তাহলে চেতনার এক নতুন, সর্বোচ্চ স্তরে পৌছাতে পারবে তুমি। একটি মানুষ যখন নিজেকে চিনতে শেখে, তখন সে স্রষ্টাকে চিনতে পারে।'
১৮, যদি তুমি ও যে তােমার প্রতি অন্যদের আচরণে পরিবর্তন আসুক, তাহলে প্রথমে নিজের প্রতি নিজের আচরণে পরিবর্তন আনাে। নিজেকে যতক্ষণ সম্পূর্ণভাবে, সত্যিকারভাবে ভালােবাসতে না পারছ, ততক্ষণ তুমি অন্যের কাছ থেকেও ভালােবাসা আশা করতে পারাে না। তবে একবার সেই পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার পর মানুষের কাছ থেকে পাওয়া কাঁটার আঘাতের জন্য মনে মনে কৃতজ্ঞ হও। কারণ কাঁটার আঘাত পাওয়ার অর্থ হচ্ছে, খুব শীঘ্রই গােলাপের বৃষ্টি নামবে তােমার উপর।
১৯, পথ তােমাকে কোথায় নিয়ে যাবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কোরাে না। তার বদলে মনােযােগ দাও তােমার প্রথম পদক্ষেপের প্রতি। সেটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ, এবং একমাত্র ধাপ যা তােমার নিয়ন্ত্রণে আছে। একবার পথে নামার পর ঘটনাপ্রবাহের স্বাভাবিক ধারায় বাধা দিও না, দেখবে সব আপনা থেকেই ঘটে যাচ্ছে। প্রবাহের সাথে গা ভাসিয়ে দিও না, বরং নিজেই সেই প্রবাহে পরিণত হও।
২০, আমাদের সবাইকে তার আদলেই সৃষ্টি করা হয়েছে, কিন্তু তারপরেও আমরা প্রত্যেকেই আলাদা, কারও সাথে কারও মিল নেই। যে কোনাে দুটি মানুষের মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান। দুইটি হৃৎপিণ্ড কখনও একই ছন্দে স্পন্দিত হয় না। স্রষ্টা যদি চাইতেন যে সবাই একই রকম হােক, তাহলে তিনি আমাদের সেভাবেই সৃষ্টি করতেন। আর তাই, এই বৈপরিত্যকে অসম্মান করা এবং নিজের ইচ্ছাকে অপরের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করার মানে প্রকারান্তরে সৃষ্টিকর্তার পবিত্র পরিকল্পনাকেই অসম্মান করা।
২১, যখন সৃষ্টিকর্তার একজন সত্যিকারের প্রেমিক কোনাে পানশালায় ঢােকে, তখন সেই পানশালাই তার প্রার্থনাগৃহে পরিণত হয়। কিন্তু যখন একজন মদ্যপ সেই একই জায়গায় প্রবেশ করে, তখন তার জন্য সেই জায়গা পানশালাই থাকে। আমরা যাই করি না কেন, আমাদের অন্তরে কি আছে সেটাই মুখ্য, আমাদের বাহ্যিক অভিব্যক্তি নয়। মানুষের চেহারা বা পরিচয় দিয়ে তাদের বিচার করে না সুফিরা। যখন একজন সুফি কারও দিকে তাকায় তখন সে বাইরের চোখজোড়া বন্ধ রাখে, এবং তৃতীয় একটি চোখ দিয়ে তাকায়-সেই চোখ, যা মানুষের অন্তরকে দেখতে পায়।'
২২,জীবন এক সাময়িক ঋণ মাত্র, এবং এই পৃথিবী কেবল সত্যিকারের বাস্তবতার এক অপটু হাতে আঁকা প্রতিকৃতি। আর শুধুমাত্র শিশুরাই আসল বস্তুর বদলে খেলনা নিয়ে খুশি থাকতে পারে। তারপরেও মানুষ হয় সেই খেলনার প্রেমে পড়ে যায়, অথবা বিতশ্রদ্ধ হয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। অথচ এই জীবনে আমাদের উচিত সব ধরনের চরম পন্থা থেকে দূরে থাকা, কারণ সেগুলাে আমাদের ভেতরের ভারসাম্যকে নষ্ট করে দেয়। সুফিরা কখনও চরম পথ অবলম্বন করে না। একজন সুফি সর্বদা শান্ত ও মধ্যপন্থী থাকে।
২৩, সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির মধ্যে মানুষের স্থান একটি আলাদা স্তরে। তার মাঝে আমি আমার নিঃশ্বাস ফুকে দিয়েছি, বলেছেন স্রষ্টা। আমাদের প্রত্যেকেই এই পৃথিবীর বুকে সৃষ্টিকর্তার প্রতিনিধি। নিজেকে জিজ্ঞেস করে দেখাে, কখনও কি সেই প্রতিনিধির মতাে আচরণ করাে তুমি? মনে রেখাে, আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য হচ্ছে নিজের ভেতরের সেই ঐশ্বরিক উপস্থিতিকে খুঁজে বের করা, এবং তার দেখানাে পথে জীবনযাপন করা।
২৪, নরক তাে এখানেই, এই মুহূর্তেই। স্বর্গও তাই। নরক নিয়ে ভয় পাওয়া অথবা স্বর্গের আশায় থাকা ছেড়ে দাও, কারণ তারা উভয়েই এই মুহূর্তেই বিদ্যমান। প্রতিবার যখন আমরা ভালােবাসি, তখনই আমরা স্বর্গের সন্ধান পাই। আর প্রতিবার যখন আমরা ঘৃণা করি, হিংসা করি, অথবা কারও সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হই, তখনই নরকের আগুন আমাদের গ্রাস করে।
২৫, প্রত্যেক পাঠকের জন্যই পবিত্র কোরআনকে বােঝার ক্ষমতা আলাদা আলাদা, যা নির্ভর করে তার নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার উপর। এই বুদ্ধিমত্তার চারটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায় হলাে বাইরের অর্থ। বেশিরভাগ মানুষ এই অর্থটুকু বুঝেই সন্তুষ্ট থাকে। পরবর্তী পর্যায়ের নাম বাতম-বা ভেতরের অর্থ। তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছে ভেতরের মধ্যকার ভেতরের অর্থ। আর চতুর্থ পর্যায়টি এতই গভীর যে তাকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, ফলে তা চিরকালই বর্ণনার বাইরে থেকে যায়।
২৬ এই মহাবিশ্ব এক পূর্ণাঙ্গ সত্তা। এর ভেতরের সবাই, সব কিছু পরস্পরের সাথে বিভিন্ন কাহিনীর এক অদৃশ্য সুতােয় বন্দী। হয়তাে আমাদের জানা নেই, কিন্তু আমরা সবাই এক নিঃশব্দ কথােপকথনের অংশীদার। কারও কোনাে ক্ষতি কোরাে না। দয়ালু হও। কারও পেছনে তাকে নিয়ে গুজব রটিও না-এমনকি আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ কোনাে কথাও বােলাে না! আমাদের মুখ থেকে যে কথা বেরিয়ে আসে তা হাওয়ায় মিলিয়ে যায় না, বরং অসীমের মাঝে রয়ে যায় অনন্তকালের মতাে। সঠিক সময়ে তারা আবার ফিরে আসে আমাদের কাছে। একজন মানুষের ব্যথা আমাদের সবাইকে ব্যথা দিতে পারে। একজন মানুষের আনন্দে আনন্দিত হতে পারে সকল মানুষ।
২৭, এই পৃথিবী হচ্ছে তুষারে ঢাকা পর্বতমালার মতাে, যা তােমার কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি তৈরি করতে পারে। তুমি ভালাে বা খারাপ যাই বলাে না কেন, তা একভাবে না একভাবে তােমার কাছেই ফিরে আসে, তাই কেউ যদি তােমার সম্পর্কে কুচিন্তা করে, তাহলে তার সম্পর্কে খারাপ কথা বললে তাতে পরিস্থিতি আরও খারাপই হয় শুধু। ক্ষতিকর শক্তির এক ভয়ঙ্কর চক্রে তখন আটকা পড়ে যাও তুমি। তার চাইতে চল্লিশ দিন এবং চল্লিশ রাত সেই ব্যক্তির সম্পর্কে ভালাে কথা বলাে, ভালো চিন্তা করাে। চল্লিশ দিনের শেষে সব কিছুই বদলে যাবে, কারণ তুমি নিজে তখন বদলে যাবে ভেতর থেকে।'
২৮, অতীত হচ্ছে কিছু স্মৃতির সমষ্টি। ভবিষ্যৎ হচ্ছে এক বিভ্রান্তি। এই পৃথিবীতে সময় কখনও সরলরেখার মতাে অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে প্রবাহিত হয় না। বরং অন্তহীন চক্রের মতাে কেবল বয়ে চলে আমাদের ভেতর দিয়ে, আমাদের মধ্য দিয়ে।চিরকাল মানে অসীম সময় নয়, বরং সময়ের অনুপস্থিতি। তুমি যদি অনন্ত আলােকিত হওয়ার অভিজ্ঞতা নিতে চাও, তাহলে অতীত এবং ভবিষ্যতের ধারণাকে মন থেকে দূর করে দাও, কেবল বর্তমানেই বাঁচতে শেখাে।
২৯ নিয়তি অর্থ এই নয় যে তােমার জীবনের সব খুঁটিনাটি আগে থেকেই লেখা আছে। তুমি যদি সব কিছু নিয়তির উপর ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকো, এই মহাবিশ্ব জুড়ে ধ্বনিত হওয়া সংগীতে নিজের সুরকে যােগ না করো তাহলে তা একেবারেই নির্বুদ্ধিতা। মহাবিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে যায় এই সুরএবং যাকে রচনা করা হয়েছে চল্লিশটি ভিন্ন ভিন্ন স্তরে।
তােমার নিয়তি হচ্ছে সেই স্তর, যেখানে তােমার নিজের সুরকে বাজাবে তুমি। কোন যন্ত্রে বাজাবে তা হয়তাে তােমার হাতে নেই, কিন্তু সেটাকে কত ভালাে বাজাতে পারবে তা নির্ভর করে একান্তই তােমার উপর।
৩০, সত্যিকারের সুফি হলাে সেই ব্যক্তি শত অন্যায় অভিযােগ, আক্রমণ এবং শাস্তির শিকার হওয়ার পরেও ধৈর্যের সাথে তাকে সহ্য করে যায়, এবং সমালােচকদের বিরুদ্ধে একটি কড়া কথাও উচ্চারণ করে না। একজন সুফি কখনও তার বিরুদ্ধে কোনাে দোষারােপকে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে না। “আত্ম” বা “নিজ” এর বােধই যদি না থাকে, তাহলে প্রতিপক্ষ বা প্রতিযােগী, এমনকি "অপর" এর ধারণাই বা কিভাবে আসবে? সবাই যখন এক, তখন অপর কোনাে ব্যক্তির বিরুদ্ধে কিভাবে অভিযোগ আনা যায়?
৩১ যদি তুমি তােমার বিশ্বাসকে মজবুত করতে চাও, তাহলে অন্তরকে নরম করাে। বিশ্বাসকে পাথরের মতাে শক্ত করে তােলার জন্য অন্তরকে পালকের মতাে মােলায়েম করে তােলা। প্রয়ােজন। রােগব্যাধি, দুর্ঘটনা, ক্ষয়ক্ষতি বা ভয়ভীতির মধ্য দিয়ে আমরা এমন সব ঘটনার মুখােমুখি হই যেগুলাে আমাদের শেখায় স্বার্থপর ও সমালােচক হওয়ার বদলে আরও দয়ালু এবং মহৎ হতে। আমাদের মাঝে কোনাে কোনাে মানুষ সেই শিক্ষাকে গ্রহণ করে নিজেদের নরম করে তােলে ঠিকই, কিন্তু বাকিরা আগের চাইতেও শক্ত ও কর্কশ হয়ে ওঠে। সত্যের কাছাকাছি যাওয়ার একমাত্র উপায় হলাে হৃদয়কে প্রসারিত করা, যাতে সেখানে মানবিকতার সবটুকুকে জায়গা দেয়ার পরেও ভালােবাসার জন্য জায়গা থাকে।
৩২,তােমার এবং সৃষ্টিকর্তার মাঝে কোনাে কিছুকে বাধা হতে দিও না। কোনাে নেতা, পুরােহিত, ধর্মযাজক, অথবা অন্য কোনাে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ যেন এই সুযােগ না পায়। কোনাে আধ্যাত্মিক শিক্ষক, এমনকি তােমার বিশ্বাসকেও দাঁড়াতে দিও না নিজেদের মাঝখানে। নিজের মূল্যবােধ এবং নিয়মের উপর আস্থা রাখাে, কিন্তু সেগুলাে কখনও অপরের উপর চাপিয়ে দিও না। যদি অপরকে কষ্ট দিতে থাকে, তাহলে যতই ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করাে না কেন-কখনও তা যথেষ্ট হবে না।
সব ধরনের প্রতীক পৃূজা থেকে দূরে থাকো, কারণ তারা তোমার দিষ্টিকে সীমাবদ্ধ করে দেবে। কেবল সৃষ্টিকর্তাকেই তােমার পথপ্রদর্শক হিসেবে মেনে নাও। সত্যকে জানাে, বন্ধু, কিন্তু সেই সত্যকে কখনো বিক্রিত করো না।
৩৩, এই পৃথিবীর সবাই কোথাও না কোথাও পৌছাতে চাইছে, নিজের পরিচয় তৈরি করতে চাইছে। অর্থচ মুত্যুর পর এই সবই পেছনে ফেলে যেতে হবে তাদের। তার চেয়ে তুমি চেষ্টা করাে শূন্যতার সাথে একাত্ম হওয়ার। এই জীবনকে অতিবাহিত করাে আলাের মতাে হালকা হয়ে, শূন্য নামের সংখ্যাটির মতাে শূন্য হয়ে। আমাদের তুলনা করা যায় একটি পাত্রের সাথে। বাইরের কারুকাজ বা অলংকরণ নয়, ভেতরে বিরাজমান শূন্যতাই আমাদের স্থির রাখে। আর সে জন্যই, আমরা জীবনে কি অর্জন করলাম তা গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং সব কিছুর অসারতা সম্পর্কে সচেতনতাই আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।
৩৪ আত্মসমর্পণের অর্থ দুর্বলতা বা নিষ্ক্রিয়তা নয়। এর মাধ্যমে অদৃষ্টবাদও বােঝায় না, হার মেনে নেয়াও বােঝায় না। বরং ঠিক তার উল্টো। নিজেকে সমর্পণ করতে পারলেই মেলে প্রকৃত শক্তি-যে শক্তি আসে ভেতর থেকে। যারা জীবনের স্বর্গীয় উৎসের কাছে নিজেদের সমর্পণ করতে পারে তারাই শুধু জানে, পৃথিবীতে একের পর এক ঝড় বয়ে গেলেও তার মাঝেই কিভাবে নিশ্চিত প্রশান্তির মাঝে বাস করা যায়।
৩৫,এই পৃথিবীতে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারি আমাদের করি মিল অথবা ধারাবাহিকতার কারণে নয়, বরং ঠিক তার উল্টো। মহাবিশ্বের বুকে যত অমিল এবং পার্থক্য রয়েছে, তারা সবাই আমাদের প্রত্যেকের মাঝে উপস্থিত। তাই বিশ্বাসীর উচিত তার মাঝে লুকিয়ে থাকা অবিশ্বাসীর মুখােমুখি হওয়া। এবং অবিশ্বাসীর উচিত তার ভেতর যে নীরব বিশ্বাসী রয়েছে তাকে সামনে নিয়ে আসা। ইনসান-ই- কামিল, অর্থাৎ নিখুঁত মানবে পরিণত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই
প্রয়ােজন হয় বিশ্বাসের। আর সেই বিশ্বাস চলে তারই বিপরীতের পাশাপাশি যার নাম অবিশ্বাস।
৩৬, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার নিয়মের উপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে এই পৃথিবী। ভালােবাসার একটি বিন্দুও যেমন কখনও বৃথা যায় না, তেমনি কণামাত্র পাপও তার শাস্তি ঠিকই পায়। অন্যরা তােমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বা চালাকি করলে তা নিয়ে ভয় পেও না। যদি কারও ফাঁদকে ভয় পেতেই হয় তবে তিনি হলেন স্রষ্টা। তার ফাঁদই সবচেয়ে বড় ফাঁদ। তার অনুমতি ছাড়া গাছের একটি পাতাও নড়ে না। এই কথাটির উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখাে। সৃষ্টিকর্তা যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন।
৩৭ সৃষ্টা হচ্ছেন এক দক্ষ ঘড়ি-নির্মাতা। তার হিসাব এতই সূক্ষ্ম পৃথিবীর প্রতিটি ঘটনাই তাদের নির্ধারিত সময়ে ঘটে। এক মুহূর্ত আগেয় নয়, এক মুহূর্ত পরেও নয়। প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি প্রাণীর জন্যই এই ঘড়ির হিসাব নিখুঁত। প্রত্যেকের জন্যই সময় আসে ভালােবাসার, এবং সময় আসে মৃত্যুর।
৩৮, আমি কি আমার জীবনধারাকে বদলাতে প্রস্তুত? আমি কি প্রস্তুত, ভেতর থেকে পরিবর্তিত হতে?”
তােমার জীবনের অসংখ্য দিনের মধ্যে একটি মাত্র দিনও যদি তার আগের দিনের মতাে হয়, তাহলে তাহলে তােমার জন্য করুণা। প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে সাথে মানুষের উচিত বারবার নতুন করে জন্ম নেয়া। নতুন করে জীবন শুরু করতে হলে একটি পদক্ষেপ বাধ্যতামূলক মৃত্যুর আগেই তার স্বাদ নেয়া।
৩৯,পরিবর্তন আসে উপাদানসমূহে, কিন্তু তাদের সমষ্টিতে কোনাে পরিবর্তন হয় না। পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া প্রতিটি তস্করের বদলে নতুন একজন জন্ম নেয়, প্রতিটি ভালাে মানুষের বদলে আসে আরেকজন ভালাে মানুষ। এই নিয়মের কারণেই কোনাে কিছু যেমন চিরকাল একই থাকে না, তেমনি আবার কোনাে কিছুই কখনও বদলায় না। প্রতিটি সুফির মৃত্যুর সাথে সাথে জন্ম হয় আরেকজন সুফির।
আমাদের ধর্ম, ভালােবাসার ধর্ম। আমরা সবাই হৃদয়ের অদৃশ্য বন্ধনে যুক্ত। সেই বন্ধন যদি কোথাও ভেঙে যায়, তাহলে অন্য কোথাও তা জোড়া লাগে। প্রতিবার যখন কোনাে শামস তাবরিজি মারা যায়; অন্য কোনাে যুগে, অন্য কোনাে নামে জন্ম নেয় আরেক শামস তাবরিজি। নাম বদলায়, মানুষ আসে আর যায় কিন্তু তাদের সত্তা, তাদের অস্তিত্ব কখনও বদলায় না।
৪০, ভালােবাসা ছাড়া যে জীবন, তার কোনাে মূল্য নেই। নিজেকে প্রশ্ন কোরাে না যে কেমন ভালােবাসা চাই তােমার; আধ্যাত্মিক বা বস্তুগত, স্বর্গীয় বা পার্থিব, পুবের অথবা পশ্চিমের... বিভেদ থেকে কেবল নতুন বিভেদেরই জন্ম হয়। ভালােবাসার কোনাে নাম হয় না, কোনাে সংজ্ঞা হয় না। ভালােবাসা হলাে ভালােবাসা, বিশুদ্ধ এবং খাঁটি ভালােবাসা। ভালােবাসা হলাে জীবনের জন্য পানি স্বরূপ। আর যে ভালােবাসে, তার সত্তায় জ্বলে ওঠে আগুন!
আগুন যখন পানিকে ভালােবাসে, তখন এমনকি এই মহাবিশ্বের গতিও বদলে যায়
c@(মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী (র:) পেজ থেকে)